প্রচারণা ডটকম: কমলা রঙের ঝকঝকে বোতল, ঝাঁঝালো স্বাদ—ফ্যান্টা আজ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পরিচিত একটি সফট ড্রিংক। দোকানের তাকজুড়ে থাকা এই পানীয়ের পেছনে যে এক অস্বস্তিকর ইতিহাস লুকিয়ে আছে, তা অনেকেই জানেন না। ফ্যান্টার জন্মের গল্প জড়িয়ে আছে ফ্যাসিবাদ, যুদ্ধ, করপোরেট রাজনীতি এবং নাৎসি জার্মানির সঙ্গে এক অস্বাভাবিক সহযোগিতার ইতিহাসে।
একটি সাধারণ সফট ড্রিংকের পেছনে এতটা অন্ধকার অধ্যায় থাকতে পারে—তা কল্পনা করাই কঠিন। কিন্তু ফ্যান্টার ইতিহাস ঠিক তেমনই।
শুরুটা কোকা–কোলা থেকে
ফ্যান্টার গল্প বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে কোকা–কোলার জন্মকথায়। ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কোকা–কোলার উদ্ভাবক ছিলেন ড. জন স্টিথ পেম্বারটন—একজন রসায়নবিদ ও চিকিৎসক, যিনি গৃহযুদ্ধে আহত হয়ে মরফিনে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। সেই আসক্তি থেকে মুক্তির আশায় তিনি এমন একটি বিকল্প ওষুধ খুঁজছিলেন, যা ব্যথা উপশম করবে কিন্তু আফিমজাত নয়।
প্রথম কোকা–কোলার ফর্মুলায় ছিল কোকা পাতার নির্যাস ও কোলা বাদাম। কোকা পাতা থেকেই তৈরি হয় কোকেন—আজ যা নিষিদ্ধ মাদক হিসেবে কুখ্যাত। তবে উনিশ শতকে কোকেনকে ব্যথানাশক ওষুধ হিসেবেই দেখা হতো। কোলা বাদাম আবার ক্যাফেইনের উৎস।
নিষেধাজ্ঞার সময় যুক্তরাষ্ট্রে মদ্যপ পানীয়ের বিকল্প হিসেবে অ্যালকোহলবিহীন ‘সফট ড্রিংক’-এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। সেখানেই কোকা–কোলার উত্থান। শুরুতে এটি বিক্রি হতো ওষুধের দোকানের সোডা ফাউন্টেনে—কার্বনেটেড পানির সঙ্গে মিশিয়ে।
একটি বৈশ্বিক করপোরেশনে রূপান্তর
পেম্বারটন নিজে কোকা–কোলার বৈশ্বিক সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। তবে তাঁর মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে কোকা–কোলা এক বিশাল করপোরেশনে রূপ নেয়। সিরাপের বদলে বোতলজাত ও পরে ক্যানজাত পানীয় হিসেবে বাজারে আসে কোকা–কোলা। যুক্তরাষ্ট্রের গণ্ডি পেরিয়ে এটি ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপসহ বিশ্বের নানা দেশে।
জার্মানিতে কোকা–কোলার কার্যক্রম পরিচালনা করত কোকা–কোলা ডয়চল্যান্ড বা কোকা–কোলা জিএমবিএইচ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে ছিলেন ম্যাক্স কিথ নামে এক নির্বাহী।
যুদ্ধ শুরু হলে এবং পরে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে জার্মানিতে কোকা–কোলার মূল সিরাপ আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে নাৎসি জার্মানিতে কোকা–কোলার উৎপাদন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ফ্যান্টার জন্ম: অভাব থেকেই উদ্ভাবন
এই সংকটেই জন্ম নেয় ফ্যান্টা। ম্যাক্স কিথ সিদ্ধান্ত নেন—কোকা–কোলার বিকল্প হিসেবে নতুন একটি পানীয় তৈরি করতে হবে। কিন্তু যুদ্ধকালীন জার্মানিতে চিনি, ফলসহ প্রায় সব খাদ্য উপাদানই ছিল রেশনভুক্ত।
ফলে ফ্যান্টা তৈরি হয় ‘উচ্ছিষ্টের উচ্ছিষ্ট’ দিয়ে—আপেলের খোসা ও পাল্প, বিট থেকে তৈরি চিনি এবং দুধ থেকে পনির তৈরির পর যে তরল অংশ থাকে, সেই হুই। স্বাদ যে খুব ভালো ছিল, এমনটা কেউই দাবি করেন না।
তবু এই পানীয় বিক্রি হয় ব্যাপকভাবে। আসলে অনেক জার্মান পরিবার ফ্যান্টা পান করত না, বরং এটি ব্যবহার করত স্যুপ বা স্টু রান্নায় মিষ্টি স্বাদ যোগ করার জন্য। যুদ্ধকালীন বাস্তবতায় সেটুকুই ছিল বড় প্রাপ্তি।
‘ফ্যান্টা’ নামটি এসেছে জার্মান শব্দ ‘ফ্যান্টাসি’ বা কল্পনা থেকে। কিথ তাঁর বিপণন দলকে নাম ভাবতে বলেছিলেন ‘কল্পনা ব্যবহার করে’। সেখান থেকেই এক বিক্রয়কর্মী নামটি প্রস্তাব করেন।
নাৎসিদের পানীয়? সম্পর্কটা কতটা গভীর ছিল
এখানেই গল্পটি অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র বলছে, ম্যাক্স কিথ নাৎসি সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন, যাতে ফ্যান্টার উৎপাদন চলমান থাকে। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নাৎসি পার্টির সদস্য ছিলেন না বলে দাবি করা হলেও, সরকারের সহযোগিতা ছাড়া ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব ছিল।
যুদ্ধের আগেও কোকা–কোলা নাৎসি জার্মানির সঙ্গে ব্যবসা করতে দ্বিধা করেনি। ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকের পৃষ্ঠপোষক ছিল কোকা–কোলা, এমনকি স্বস্তিকা চিহ্নের পাশে কোকা–কোলার ব্যানারও টাঙানো হয়েছিল।
একটি সূত্রে জানা যায়, কোকা–কোলা জিএমবিএইচ–এর দশম বর্ষপূর্তিতে ম্যাক্স কিথ কর্মীদের দিয়ে নাৎসি স্যালুট করান। দিনটি ছিল হিটলারের ৫০তম জন্মদিন।
যুদ্ধ চলাকালে নাৎসিরা ইউরোপের যেসব দেশ দখল করে, সেসব দেশের কোকা–কোলা ব্যবসাও জার্মান শাখার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
যুদ্ধের পরের ফ্যান্টা
যুদ্ধ শেষে ফ্যান্টার ইতিহাস নতুন মোড় নেয়। আশ্চর্যজনকভাবে, নাৎসি জার্মানিতে ব্যবসা ধরে রাখার জন্য ম্যাক্স কিথকে শাস্তি তো দেওয়া হয়ইনি, বরং কোকা–কোলার প্রধান কার্যালয় তাঁকে ইউরোপ অঞ্চলের প্রধান হিসেবে পদোন্নতি দেয়।
ফ্যান্টাকে নতুনভাবে বাজারজাত করা হয় ইতালিতে—উজ্জ্বল কমলা রঙের, ফলের স্বাদযুক্ত একটি পানীয় হিসেবে। সেখান থেকে ধীরে ধীরে এটি ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে।
আজকের ফ্যান্টার সঙ্গে যুদ্ধকালীন জার্মান ফ্যান্টার মিল প্রায় নেই বললেই চলে—না স্বাদে, না রঙে, না ভাবমূর্তিতে।
ব্র্যান্ডিংয়ের জয়, ইতিহাসের বিস্মৃতি
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—নাৎসি জার্মানির সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার পরও ফ্যান্টা কীভাবে আজও জনপ্রিয়?
উত্তর সহজ নয়। তবে এটি প্রমাণ করে, শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং এবং ইতিহাস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা কীভাবে একটি পণ্যের অতীত ঢেকে দিতে পারে।
একসময় যুদ্ধকালীন অভাবের প্রতীক ছিল যে পানীয়, আজ সেটিই বিশ্বজুড়ে তরুণদের আড্ডার অংশ।
