রবিবার, জানুয়ারি ২৫, ২০২৬
More

    সর্বশেষ

    প্লুটো কেনো গ্রহ নয়?

    প্রচারণা ডটকম: সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা গ্রহগুলোর তালিকায় একসময় একটি নাম ছিল—প্লুটো। স্কুলের বই থেকে শুরু করে পোস্টার, ছড়া কিংবা শিশুদের মুখস্থ তালিকায়—প্লুটো ছিল সৌরজগতের নবম গ্রহ। কিন্তু ২০০৬ সালে হঠাৎ করেই সেই পরিচয় বদলে যায়। গ্রহ থেকে প্লুটো নেমে যায় ‘বামন গ্রহ’-এর কাতারে। প্রশ্ন উঠতে থাকে—কেন? বিজ্ঞান কি হঠাৎ করেই ইতিহাস ভুলে গেল?

    ২০০৬ সালের সিদ্ধান্ত: বিজ্ঞান বনাম আবেগ

    ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন (আইএইউ) একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়। সংস্থাটি ঘোষণা করে, প্লুটো আর গ্রহ নয়; এটি এখন পাঁচটি স্বীকৃত বামন গ্রহের একটি।

    ঘোষণার পরপরই বিশ্বজুড়ে শুরু হয় প্রতিবাদ। অনেকেই যুক্তি দেন, এটি বিজ্ঞানের অগ্রগতি নয়—বরং ঐতিহ্য আর ইতিহাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। দশ বছর পেরিয়েও সেই আবেগ কমেনি। বহু মানুষ আজও প্রশ্ন করেন, “আমাদের শৈশবের গ্রহটা কেড়ে নেওয়া হলো কেন?”

    কিন্তু এই সিদ্ধান্ত কি শুধুই আবেগের বিপরীতে বিজ্ঞান দাঁড় করানোর নাম? নাকি এর পেছনে ছিল শক্ত বৈজ্ঞানিক যুক্তি?

    গ্রহ’ শব্দটির নতুন সংজ্ঞা

    ২০০৬ সালের আইএইউ সাধারণ পরিষদের মূল আলোচ্য বিষয়ই ছিল—গ্রহ বলতে আসলে কী বোঝায়? অবাক করার মতো বিষয় হলো, তার আগে পর্যন্ত ‘গ্রহ’ শব্দটির কোনো আনুষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা ছিল না।

    দীর্ঘ বিতর্কের পর আইএইউ একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো বস্তুকে গ্রহ হতে হলে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে।

    প্রথমত, সেটিকে সূর্যের চারদিকে ঘুরতে হবে।

    দ্বিতীয়ত, নিজের মাধ্যাকর্ষণের কারণে সেটির আকার গোলাকার হতে হবে।

    তৃতীয়ত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নিজের কক্ষপথের আশপাশে থাকা অন্যান্য বস্তু ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে দিয়ে কক্ষপথে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

    প্লুটোর সীমাবদ্ধতা কোথায়?

    প্লুটো প্রথম দুটি শর্ত পূরণ করে। এটি সূর্যের চারদিকে ঘোরে এবং নিজের মাধ্যাকর্ষণের কারণে এটি প্রায় গোলাকার। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তৃতীয় শর্তে।

    প্লুটো এতটা বড় নয় যে, নিজের কক্ষপথের আশপাশের বস্তুগুলো সরিয়ে ফেলতে পারে। কুইপার বেল্ট নামে পরিচিত বরফাচ্ছন্ন অঞ্চলটির সঙ্গে প্লুটো তার কক্ষপথ ভাগ করে নেয়। অর্থাৎ, সেখানে প্লুটো একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি।

    এই কারণেই বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান—প্লুটো পূর্ণাঙ্গ গ্রহ নয়, বরং বামন গ্রহ।

    বামন গ্রহ কি অবমূল্যায়ন?

    শুনতে ‘ডিমোশন’ বা অবনমন মনে হলেও, বামন গ্রহ হওয়া মানে প্লুটোর গুরুত্ব কমে যাওয়া নয়। বরং এটি সৌরজগতকে আরও পরিষ্কারভাবে বোঝার একটি ধাপ।

    বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্লুটোর মতো আরও অনেক বস্তু রয়েছে, যেগুলো আকারে গোলাকার হলেও কক্ষপথে আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। নতুন সংজ্ঞা না থাকলে ভবিষ্যতে গ্রহের সংখ্যা বাড়তেই থাকত—সৌরজগত হয়ে উঠত আরও বিভ্রান্তিকর।

    ঐতিহ্য ভাঙার সাহস

    প্লুটোর গ্রহ মর্যাদা হারানো অনেকের কাছে আবেগী আঘাত হলেও, বিজ্ঞানীদের চোখে এটি ছিল সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলেছে, বিস্তৃত হয়েছে। সেই নতুন জ্ঞানকে গ্রহণ করতেই পুরোনো সংজ্ঞা বদলানো জরুরি হয়ে পড়েছিল।

    প্লুটোর ‘অবনমন’ আসলে কোনো পিছিয়ে পড়া নয়—বরং বিজ্ঞানের আলোয় এক ধাপ সামনে এগিয়ে যাওয়া।

    শেষ কথা

    প্লুটো আজ আর গ্রহ নয়, কিন্তু সে তার গুরুত্ব হারায়নি। বরং নতুন পরিচয়ে এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বিজ্ঞান স্থির নয়, বদলায়। আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়েই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হয়।

    হয়তো তাই প্লুটোর গল্প শুধু একটি গ্রহের নয়—এটি বিজ্ঞানের বিবর্তনের গল্প।

    সর্বশেষ

    পড়েছেন তো?

    Stay in touch

    To be updated with all the latest news, offers and special announcements.