প্রচারণা ডটকম: এক মুহূর্ত কল্পনা করুন- পৃথিবীতে আর কোনো মরুভূমি নেই। সাহারা, গোবি কিংবা আরবের বিস্তীর্ণ বালুময় প্রান্তর সবই সবুজে ঢাকা। শুনতে অবাস্তব মনে হলেও ইতিহাস বলছে, এটি অসম্ভব নয়। আজ যে সাহারা মরুভূমিকে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শুষ্ক অঞ্চল হিসেবে জানি, সেটি একসময় ছিল নদী, হ্রদ, ঘাসভূমি ও বন্যপ্রাণীতে ভরা এক উর্বর ভূখণ্ড।
প্রায় ১১ হাজার থেকে ৫ হাজার বছর আগে সাহারা ছিল সবুজ—এই সময়কালকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘গ্রিন সাহারা’ বা উত্তর আফ্রিকার আর্দ্র যুগ। গবেষণা বলছে, গত ৮০ লাখ বছরে পৃথিবীর অক্ষের ধীর দোলনের কারণে সাহারা এ ধরনের সবুজ রূপ নিয়েছে শত শত বার। অর্থাৎ মরুভূমির বিলুপ্তি কোনো কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং প্রকৃতিরই এক পুনরাবৃত্ত চক্র।
তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—ভবিষ্যতে যদি পৃথিবীর সব মরুভূমি আবার সবুজ হয়ে ওঠে, তার প্রভাব কী হবে? মানবসভ্যতা কি এতে উপকৃত হবে, নাকি প্রকৃতি আমাদের সামনে নতুন সংকট হাজির করবে?
পৃথিবীর বায়ুপ্রবাহে আসবে নাটকীয় পরিবর্তন
বর্তমানে পৃথিবীর মোট ভূমির প্রায় ২০ শতাংশই মরুভূমি। এসব অঞ্চল মূলত নিরক্ষরেখার ৩০ থেকে ৫০ ডিগ্রি উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশে অবস্থিত। নিরক্ষরেখার কাছে সূর্যের আলো সবচেয়ে সরাসরি পড়ে, ফলে বাতাস গরম হয়ে উপরের দিকে উঠে যায়। ওপরে উঠে ঠান্ডা হলে সেই বাতাস তার জলীয় বাষ্প ঝরিয়ে দেয় বৃষ্টির আকারে।
এই শুষ্ক ও ঠান্ডা বাতাস পরে ‘হ্যাডলি সেল’ নামে পরিচিত একটি বৈশ্বিক বায়ুচক্রের অংশ হয়ে উত্তর বা দক্ষিণের মরুভূমি অঞ্চলে পৌঁছায়। সেখানে বাতাস আবার নিচে নামে, উষ্ণ হয় এবং পথিমধ্যে আর্দ্রতা শুষে নেয়। এর ফলেই মরুভূমিগুলো হয়ে ওঠে আরও শুষ্ক।

কিন্তু সাহারা যদি সবুজে ভরে যায়, এই চক্র ভেঙে পড়বে। অতীতে দেখা গেছে, সবুজ সাহারার সময় হ্যাডলি সেল আরও বিস্তৃত হয়েছিল এবং বেশি জলীয় বাষ্প বহন করত। ফলে মৌসুমি বৃষ্টি শুধু বিস্তৃতই হয়নি, বরং আরও শক্তিশালী হয়েছিল।
এর প্রভাব পড়বে বাণিজ্যিক বাতাস বা ‘ট্রেড উইন্ড’-এর ওপর, যা ঘূর্ণিঝড় ও ট্রপিক্যাল স্টর্ম তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে। হ্যাডলি সেলের অবস্থান বদলে গেলে নতুন নতুন অঞ্চলকে ভয়াবহ ঝড়ের মুখে পড়তে হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, সাহারা থেকে উড়ে যাওয়া ধুলাবালি আটলান্টিক মহাসাগরের কিছু ঝড়কে দুর্বল করে। মরুভূমি হারালে সেই প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণও আর থাকবে না।
হারিয়ে যেতে পারে অনন্য বাস্তুতন্ত্র
মরুভূমি মানেই প্রাণহীন—এই ধারণাকে গবেষক ডায়ানা ডেভিস ‘গাছকেন্দ্রিক পক্ষপাত’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। বাস্তবে মরুভূমি পৃথিবীর সবচেয়ে অনন্য বাস্তুতন্ত্রগুলোর একটি। চরম তাপমাত্রা, স্বল্প পানি ও কঠিন পরিবেশে টিকে থাকার জন্য এখানে গড়ে উঠেছে বিশেষ ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণী।
মরুভূমি সবুজ হয়ে গেলে এসব বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। অথচ জীববৈচিত্র্য যত বেশি, পরিবেশ তত স্থিতিশীল। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধেও এক ধরনের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে।

প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, আফ্রিকার নিগারের গোবেরো অঞ্চলে একসময় কুমির, জলহস্তী, জিরাফ ও হাতির বিচরণ ছিল। এমনকি মানুষের বসবাসেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে। আজকের সাহারায় মানুষ টিকে থাকলেও, সেই বিশাল প্রাণীদের আর দেখা মেলে না।
মরুভূমি অনেক সময় অন্যান্য অঞ্চলের জন্য প্রাকৃতিক দেয়াল হিসেবেও কাজ করে। কিন্তু সবুজ মরুভূমি হয়ে উঠতে পারে এক ‘খোলা দরজা’, যার মাধ্যমে প্রাণী ও উদ্ভিদ নতুন ভূখণ্ডে প্রবেশ করবে। ‘নেচার কমিউনিকেশন্স’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সবুজ সাহারা আফ্রিকার প্রাণীদের চলাচল ও বিবর্তনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল—এর মধ্যে মানুষের ১ লাখ ২০ হাজার বছর আগের অভিবাসনও অন্তর্ভুক্ত।
প্রাণীজগতের ভারসাম্যে বড় রদবদল
সবুজ মরুভূমিতে টিকে থাকতে অনেক প্রাণীকেই বড় ধরনের অভিযোজনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। উত্তর আফ্রিকার মরু শিয়াল বা ফেনেক ফক্স তার বড় কান দিয়ে শরীরের অতিরিক্ত তাপ বের করে দেয় এবং লোমশ পা দিয়ে উত্তপ্ত বালিতে চলাফেরা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১০ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেই এই প্রাণী ঠান্ডাজনিত চাপ অনুভব করতে পারে।

তবে সব প্রাণীর জন্য পরিবর্তন এত কঠিন হবে না। মনিটর টিকটিকির কিছু প্রজাতি মরুভূমি থেকে শুরু করে আর্দ্র বন পর্যন্ত নানা পরিবেশে টিকে থাকতে পারে। এমনকি কমোডো ড্রাগনের মতো বিশাল টিকটিকিও ঘাসভূমি ও বনাঞ্চলে দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে।
ইতিহাস আরও দূরে তাকালে দেখা যায়, প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে আজকের বরফে ঢাকা অ্যান্টার্কটিকা ছিল সবুজ ও প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। তখন সেখানে মারসুপিয়াল এমনকি স্লথের আত্মীয় প্রাণীরও অস্তিত্ব ছিল।
সবুজ মরুভূমি ও বৈশ্বিক জলবায়ু সংকেত
বর্তমানে আমরা ‘মরুকরণ’ শব্দটি বেশি শুনি—যেখানে উর্বর ভূমি ধীরে ধীরে শুষ্ক হয়ে ওঠে। এর বিপরীতে মরুভূমি সবুজ হওয়ার ধারণা আকর্ষণীয় হলেও জলবায়ুর ওপর এর প্রভাব অত্যন্ত জটিল।
কিছু গবেষণা বলছে, মরুভূমি কার্বন ডাই অক্সাইড ধরে রেখে জলবায়ু উষ্ণতা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। আবার প্রাচীন সবুজ সাহারার মতো তৃণভূমিও বিপুল পরিমাণ কার্বন ধরে রাখতে সক্ষম।

অন্যদিকে আর্কটিক ও অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলও মরুভূমির অন্তর্ভুক্ত, কারণ সেখানে বৃষ্টিপাত অত্যন্ত কম। এসব অঞ্চলের বরফ ও সাগরপ্রবাহ—বিশেষ করে অ্যান্টার্কটিক সার্কাম্পোলার কারেন্ট—বিশ্বের আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। অতীতে বরফ গলে যাওয়ায় এই স্রোত আরও দ্রুত ও অস্থির হয়েছিল।
আজকের দিনে মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন আরও দ্রুত ঘটছে। পারমাফ্রস্ট গলে অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ বৈশ্বিক উষ্ণতাকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
শেষ কথা
মরুভূমিহীন পৃথিবী মানেই শুধু সবুজ প্রান্তর আর বেশি বৃষ্টি নয়। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বায়ুপ্রবাহ, ঝড়, জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ুর সূক্ষ্ম ভারসাম্য। মরুভূমি হারালে পৃথিবী বদলে যাবে—হয়তো আরও সুন্দর দেখাবে, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে নতুন ও গভীর সংকট।
